ইসরাইল

অবস্থানঃ ইসরায়েল পশ্চিম এশিয়া তথা মধ্যপ্রাচ্যের একটি রাষ্ট্র। এটি ভূমধ্যসাগরের দক্ষিণ-পূর্ব তীরে ও লোহিত সাগরের উত্তর তীরে অবস্থিত। দেশটির উত্তর স্থলসীমান্তে লেবানন, উত্তর-পূর্বে সিরিয়া, পূর্বে জর্দান ও ফিলিস্তিনি-অধ্যুষিত ভূখন্ড পশ্চিম তীর, পশ্চিমে ফিলিস্তিনি ভূখন্ড গাজা উপত্যকা এবং দক্ষিণ-পশ্চিমে মিশর অবস্থিত।

ইসরায়েল সমগ্র জেরুসালেম শহরকে তার রাজধানী হিসেবে দাবী করে আসছে, যদিও এই মর্যাদা সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রই স্বীকার করে না। শহরের পশ্চিমভাগ ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণাধীন এবং এখানে দেশটির সরকারী প্রতিষ্ঠানগুলি অবস্থিত। অর্থনৈতিকভাবে ইসরায়েল একটি অত্যন্ত উন্নত শিল্পপ্রধান রাষ্ট্র। ভূমধ্যসাগরের উপকূলে অবস্থিত তেল আভিভ দেশটির অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত প্রাণকেন্দ্র এবং বৃহত্তম নগর এলাকা। এটিই বিশ্বের একমাত্র রাষ্ট্র যেখানে ইহুদীরা সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়। ইসরায়েলের জনগণ অত্যন্ত উচ্চশিক্ষিত।

ইসরায়েল নিজেকে একটি ইহুদী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে দাবী করে। এখানে একটি প্রতিনিধিত্বমূলক সংসদীয় গণতন্ত্র বিদ্যমান। এর এককক্ষবিশিষ্ট আইনসভার নাম নেসেট। প্রধানমন্ত্রী সরকারপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেন।

ইসরায়েলের জন্ম, ইতিহাস ও রাজনীতি মধ্যপ্রাচ্য সংকটের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। স্বাধীনতা ঘোষণার পর থেকেই ইসরায়েল প্রতিবেশী আরব রাষ্ট্রগুলির সাথে বেশ কয়েকবার যুদ্ধে লিপ্ত হয়। দেশটি ১৯৬৭ সাল থেকে ফিলিস্তিনি-অধ্যুষিত পশ্চিম তীর ও গাজা উপত্যকা সামরিকভাবে দখল করে আছে। বর্তমানে পৃথিবীর ১৬১টি রাষ্ট্র ইসরায়েলকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও ৩১টি রাষ্ট্র (মূলত মুসলমান অধ্যুষিত) এখনও ইসরায়েলের সার্বভৌমত্ব মেনে নেয়নি এবং দেশটির সাথে তাদের কোনও কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। তাদের অনেকের মতে ইসরায়েল স্বাধীন রাষ্ট্র ফিলিস্তিনের একটি অংশের অবৈধ দখলদার বাহিনীর নিয়ন্ত্রিত ভূখণ্ড। তবে নিকটতম দুই আরব প্রতিবেশী মিশর ও জর্দানের সাথে ইসরায়েল শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করেছে ও দেশ দুইটির স্বীকৃতিও লাভ করেছে।

ইতিহাস

সপ্তম শতকে মুসলিমরা ইসরায়েল ভূখণ্ডটি তাদের দখলে নিয়ে নেয়, ১০৯৯ সালে এটি খ্রিস্টানদের দখলে যায়, ১১৮৭ সালে এটি আবার আইয়ুবীয় রাজবংশ এর অধীনে চলে যায়, ত্রয়োদশ শতাব্দীতে ইসরায়েল মিশরের মামলুক সুলতান এর নিয়ন্ত্রণে আসে, ১৫১৭ সালে এটি উসমানীয় সাম্রাজ্যভুক্ত হয়; ইহুদীরা সপ্তম শতাব্দী থেকেই বিভিন্ন জায়গায় পালিয়ে বেড়িয়েছে এবং পরে তারা ইউরোপ মহাদেশে পাড়ি জমায়।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তুরস্কের উসমানীয় সাম্রাজ্যের পতনের পর ইসরায়েল ভূখণ্ডটি ব্রিটিশরা তাদের অধীনে নিয়ে নেয় এবং নাম রাখে ‘মেন্ডেটরি প্যালেস্টাইন’। ১৯১৭ সালের ২রা নভেম্বর ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী আর্থার জেমস বেলফোর ইহুদীবাদীদেরকে লেখা এক পত্রে ফিলিস্তিনী ভূখন্ডে একটি ইহুদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি ঘোষণা করেন। বেলফোর ঘোষণার মাধ্যমে ফিলিস্তিনে ইহুদিদের আলাদা রাষ্ট্রের সম্ভাবনা উজ্জ্বল হয় এবং বিপুলসংখ্যক ইহুদি ইউরোপ থেকে ফিলিস্তিনে এসে বসতি স্থাপন করতে থাকে।

১৯২৩ সালে স্বাধীন তুরস্কের জন্ম হলে এই অঞ্চলে ইহুদীরা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য উদগ্রীব হয়ে যান। ইউরোপের বিভিন্ন দেশ যেমন ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানী, নরওয়ে, পোল্যান্ড, গ্রীস এবং সুইজাল্যান্ডে বসবাসকারী ইহুদীদেরকে নেতারা আহ্বান জানান ইসরায়েলে বসতি গড়তে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলে ইউরোপ থেকে আরো ইহুদী মানুষ ইসরায়েলে আসে

১৯৪৮ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ফিলিস্তিনী ভূখন্ডকে দ্বিখন্ডিত করা সংক্রান্ত ১৮১ নম্বর প্রস্তাব গৃহীত হয়। জাতিসংঘ ফিলিস্তিনকে দ্বিখন্ডিত করার প্রস্তাব পাশ করে ৪৫ শতাংশ ফিলিস্তিনীদের এবং বাকি ৫৫ শতাংশ ভূমি ইহুদীবাদীদের হাতে ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এভাবে ১৯৪৮ সালের ১৪ মে ইসরায়েল স্বাধীনতা ঘোষণা করে। ড্যাভিড বেন গুরিয়ন ইসরায়েলের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।

১৯৪৮ সালের ১৭ মে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন ইসরায়েলকে প্রথম স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ১৯৪৯ সালের মার্চ মাসে তুরস্ক সরকার ইসরায়েলকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতিদানকারী প্রথম মুসলিমসংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ ছিলো।

Scroll to Top