ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর

ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর ১৭১২ সালে হুগলি জেলার ভুরশুট পরগনার পান্ডুয়া /পেঁড়ো গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ভুরশুট পরগনার জমিদার ছিলেন। মাত্র কুড়ি বছর বয়সের মধ্যে তিনি সংস্কৃত ও ফার্সি ভাষায় ব্যুৎপত্তি লাভ করেন। তিনি নবদ্বীপের রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের সভা-কবি ছিলেন। নদিয়ারাজ কৃষ্ণচন্দ্র রায় অন্নদামঙ্গল কাব্যের স্বীকৃতিতে তাঁকে ‘রায়গুণাকর’ উপাধিতে ভূষিত করেন। কাব্যটির আছে ৩টি ভাগ। এক ভাগের নাম অন্যদামঙ্গল, এক ভাগের নাম বিদ্যাসুন্দর আর অপরটির নাম ভবানন্দ-মানসিংহ কাহিনী। এ কাব্যে কবি তাঁর রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের পূর্বপুরুষ ভবানন্দ গুণকীর্তন করতে চেয়েছিলেন। এছাড়াও সত্যপীরের পাঁচালী, রসমঞ্জরী, অন্নদামঙ্গল, নাগাষ্টক, গঙ্গাষ্টক, চণ্ডীনাটক প্রভৃতি কাব্য ও বিবিধ কবিতাবলি তিনি রচনা করেন। ভারতচন্দ্র মঙ্গল কাব্যধারার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি এবং অন্নদামঙ্গল তাঁর শ্রেষ্ঠ কাব্যগ্রন্থ। শব্দ, ছন্দ, অলঙ্কার ব্যবহার ও উচ্চমানের কাব্য নির্মাণে
তাঁর নাগরিক বৈদগ্ধ্যের পরিচয় পাওয়া যায়। যথাযথভাবেই রবীন্দ্রনাথ তাঁর কাব্যকে তুলনা করেন “রাজকণ্ঠের মণিমালা”র সঙ্গে। তিনি ১৭৬০ সালে মৃত্যুবরণ করেন। এবং তাঁর মৃত্যুর সাথে বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগের সমাপ্তি হয়।

তাঁর কাব্যের অনেক পঙক্তি আজও বাংলা ভাষায় প্রবচনতুল্য। যেমনঃ

নগর পুড়িলে দেবালয় কি এড়ায়?ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর

মন্ত্রের সাধন কিংবা শরীর পাতন।ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর

মধ্যযুগের সকল কবিই যখন নিজের নায়িকাকে চাঁদের মত রূপসী বলছেন তখন ভারতচন্দ্র একধাপ এগিয়ে আরও সরস উক্তি করেছেনঃ

কে বলে শারদ শশী সে মুখের তুলা
পদনখে পড়ে আছে তাঁর কতগুলা।ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর

মধ্যযুগের এ কবি দেবদেবীর কাহিনীর মাঝে সাধারণ মানুষের চাওয়া পাওয়া গল্প জুড়ে দিয়েছেন। বলেছেন ঈশ্বরী পাটনির কথা। অন্নদা দেবী ঈশ্বরী পাটনির নৌকায় নদী পার হয়ে বললেন, কী বর চাও তুমি বল। গরীব মাঝি দেবীর সাক্ষাত পেয়ে জগতের সব ধন সম্পদ, মণিমুক্তা, সম্পত্তি চাইতে পারত। কিন্তু সে দেবিকে বলল, তাঁর সন্তান, তাঁর সবচেয়ে মুল্যবান সম্পদ যেন দুধে ভাতে থাকে।

প্রণমিয়া পাটুনী কহিছে জোড় হাতে।
আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে ॥
তথাস্তু বলিয়া দেবী দিলা বরদান।
দুধে ভাতে থাকিবেক তোমার সন্তান ॥ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর

Add a Comment