তৎপুরুষ সমাস

‘তৎপুরুষ’ শব্দটির অর্থ হল তার পুরুষ। তার পুরুষ এই শব্দ গুলির একপদীকরণে তৎপুরুষ শব্দটির সৃষ্টি হয়েছে। এখানে পূর্ব পদ(তার) থেকে সম্বন্ধ পদের বিভক্তি ‘র’ লোপ পেয়েছে ও উত্তর পদের(পুরুষ ) অর্থ প্রাধান্য পাচ্ছে।

এইভাবে এই সমাসের অধিকাংশ উদাহরণে পূর্ব পদের বিভক্তি লোপ পায় ও উত্তর পদের অর্থ প্রাধান্য থাকে এবং তৎপুরুষ শব্দটি হল এই রীতিতে নিষ্পন্ন সমাষের একটি বিশিষ্ট উদাহরণ। তাই উদাহরণের নামেই এর সাধারণ নামকরণ করা হয়েছে তৎপুরুষ সমাস।

পূর্বপদের বিভক্তির লেপে যে সমাস হয় এবং যে সমাসে পরপদের অর্থ প্রধানভাবে বোঝায় তাকে তৎপুরুষ সমাস বলে। তৎপুরুষ সমাসের পূর্বপদে দ্বিতীয়া থেকে সপ্তমী পর্যন্ত যে কোনো বিভক্তি থাকতে পারে; আর পূর্বপদের বিভক্তি অনুসারে এদের নামকরণ হয়। যেমন – বিপদকে আপন্ন= বিপদাপন্ন। এখানে দ্বিতীয়া বিভক্তি ‘কে’ লোপ পেয়েছে বলে এর নাম দ্বিতীয়া তৎপুরুষ।

চেনার উপায়ঃ
ক) পূর্বপদ বিভক্তি যুক্ত থাকে এবং সমস্তপদে বিভক্তি লোপ পায়।
খ) উত্তর পদের অর্থ প্রাধান্য পায়

প্রকারভেদ
তৎপুরুষ সমাস নয় প্রকারঃ দ্বিতীয়া, তৃতীয়া, চতুর্থ, পঞ্চমী, যষ্ঠ, সপ্তমী, নঞ, উপপদ ও অলুক তৎপুরুষ সমাস।

১. দ্বিতীয়া তৎপুরুষ সমাসঃ পূর্বপদের দ্বিতীয়া বিভক্তি (কে, রে) ইত্যাদি লোপ হয়ে যে সমাস হয়, তাকে দ্বিতীয়া তৎপুরুষ সমাস বলে। যথা: দুঃখকে প্রাপ্ত = দুঃখপ্রাপ্ত, বিপদকে আপন্ন = বিপদাপন্ন, পরলোকে গত = পরলোকগত।

ব্যাপ্তি অর্থেও দ্বিতীয়া তৎপুরুষ সমাস হয়। যেমন : চিরকাল ব্যাপিয়া সুখী = চিরসুখী। এরকম: গা-ঢাকা, রথদেখা, বীজবোনা, ভাতরাধা, ছেলে-ভুলানো (ছড়া), নভেল-পড়া ইত্যাদি।

ক্রিয়ার কাজ কখন? কোথায়? কিভাবে ঘটে, তার উত্তরে যে শব্দ আসে তাকে ক্রিয়া বিশেষণ বলে। ক্রিয়া বিশেষণের সাথে কৃদন্ত পদের দ্বিতীয়া তৎপুরুষ সমাস হয়। যেমন- দ্রুত যথা তথা গামী = দ্রুতগামী, দ্রুত যথা তথা গতি= দ্রুতগতি, পূর্ণ রূপে স্ফুট = পূর্ণস্ফুট, অর্ধ রূপে নগ্ন = অর্ধনগ্ন।

২. তৃতীয়া তৎপুরুষ সমাসঃ পূর্বপদে তৃতীয়া বিভক্তির (দ্বারা, দিয়া, কর্তৃক ইত্যাদি) লোপে যে সমাস হয়, তাকে তৃতীয়া তৎপুরুষ সমাস বলে। যথা : মন দিয়ে গড়া = মনগড়া, শ্রম দ্বারা লব্ধ = শ্রমলব্ধ, মধু দিয়ে মাখা= মধুমাখা, রব(শব্দ) দ্বারা আহুত(ডাকা হয়েছে এমন) =রবাহুত, রক্ত দ্বারা অক্ত(মাখানো)=রক্তাক্ত।

ক) উন, হীন, শূন্য প্রভৃতি শব্দ উত্তরপদ হলেও তৃতীয়া তৎপুরুষ সমাস হয়। যথা: এক দ্বারা উন = একোন, বিদ্যা দ্বারা হীন = বিদ্যাহীন, জ্ঞান দ্বারা শূন্য = জ্ঞানশূন্য, পাঁচ দ্বারা কম = পাঁচ কম।

খ) উপকরণবাচক বিশেষ্য পদ পূর্বপদে বসলেও তৃতীয়া তৎপুরুষ সমাস হয়। যথা: স্বর্ণ দ্বারা মণ্ডিত = স্বর্ণমণ্ডিত। এরূপ-হীরকখচিত, চন্দনচর্চিত, রত্নশোভিত ইত্যাদি।

গ) কখনও কখনও সমস্যমান পদের দ্বারা বিভক্তি সমস্তপদে সপ্তমী বিভক্তির এ, য় তে পরিণত হয়। যেমন তেল দ্বারা ভাজা = তেলেভাজা, বাপ দ্বারা খেদানো = বাপে খেদানো, পোকা দ্বারা কাটা = পোকায় কাটা ইত্যাদি। এ ভাবে বিভক্তির পরিবর্তন না করলে কিন্তু অর্থগতভাবে বিশাল পার্থক্যের সৃষ্টি হবে। যেমন- তেলভাজা, বাপখেদানো, পোকাকাটা!!

৩. চতুর্থী তৎপুরুষ সমাস: পূর্বপদে চতুর্থ বিভক্তি (কে, জন্য, নিমিত্ত ইত্যাদি) লোপে যে সমাস হয়, তাকে চতুর্থ তৎপুরুষ সমাস বলে । যথা— গুরুকে ভক্তি = গুরুভক্তি, আরামের জন্য কেদারা= আরামকেদারা, বসতের নিমিত্ত বাড়ি= বসতবাড়ি, বিয়ের জন্য পাগলা = বিয়েপাগলা ইত্যাদি। এরুপ-ছাত্রাবাস, ডাকমাশুল, চোষকাগজ, শিশুমঙ্গল, মুসাফিরখানা, হজ্বযাত্রা, মালগুদাম, রান্নাঘর, মাপকাঠি,বালিকা-বিদ্যালয়, পাগলাগারদ ইত্যাদি।

৪. পঞ্চমী তৎপুরুষ সমাস: পূর্বপদে পঞ্চমী বিভক্তি (হতে, থেকে, চেয়ে ইত্যাদি) লেপে যে তৎপুরুষ সমাস হয়, তাকে পঞ্চমী তৎপুরুষ সমাস বলে। যথা– খাচা থেকে ছাড়া = খাচাছাড়া, বিলাত থেকে ফেরত = বিলাতফেরত, পরাণের চেয়ে প্রিয় = পরাণপ্রিয় ইত্যাদি।

সাধারণত চ্যুত, আগত, ভীত, গৃহীত, বিরত, মুক্ত, উত্তীর্ণ, পালানো, ভ্রষ্ট ইত্যাদি পরপদের সঙ্গে যুক্ত হলে পঞ্চমী তৎপুরুষ সমাস হয়। যেমন : স্কুল থেকে পালানো = স্কুলপালানো, জেল থেকে মুক্ত = জেলমুক্ত ইত্যাদি। এ রকম জেলখালাস, বোঁটাখসা, আগাগোড়া, শাপমুক্ত, ঋণমুক্ত, সর্বশ্রেষ্ঠ, যুদ্ধোত্তর, স্নাতকোত্তর ইত্যাদি।

৫. যষ্ঠী তৎপুরুষ সমাস: পূর্বপদে যষ্ঠ বিভক্তির (র, এর) লোপ হয়ে যে সমাস হয়, তাকে যষ্ঠ তৎপুরুষ সমাস বলে। যথা: চায়ের বাগান = চাবাগান, রাজার পুত্র = রাজপুত্র, খেয়ার ঘাট = খেয়াঘাট। এরূপে নরপতি, ছাত্রবৃন্দ, নৌকাডুবি, বিড়ালছানা ইত্যাদি।

জ্ঞাতব্য
ক. ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাসে ‘রাজা’ স্থলে “রাজ”, পিতা, মাতা, ভ্রাতা স্থলে যথাক্ৰমে ‘পিতৃ’, ‘মাতৃ’, ‘ভ্রাতৃ’ হয়। ‘রাজা’ যদি প্রকৃত অর্থেই রাজা হয়, তবে ‘রাজ’ শব্দটি পরে বসে, অন্যথায় আগে বসে। যেমন গজনীর রাজা = গজনীরাজ, রাজার পুত্র = রাজপুত্র, পিতার ধন = পিতৃধন, মাতার সেবা = মাতৃসেবা, ভ্রাতার স্নেহ = ভ্রাতৃস্নেহ, পুত্রের বধূ=পুত্রবধূ ইত্যাদি।

খ. পরপদে সহ, তুল্য, নিভ, প্রায়, সহ, প্রতিম – এসব শব্দ থাকলেও যষ্ঠী তৎপুরুষ সমাস হয়। যেমন – পত্নীর সহ =পত্নীসহ, কন্যার সহ = কন্যাসহ, সহোদরের প্রতিম = সহোদরপ্রতিম/সোদরপ্রতিম ইত্যাদি।

গ. কালের কোনো অংশবোধক শব্দ। পরে থাকলে তা পূর্বে বসে। যথা— অহ্নের (দিনের) পূর্বভাগ = পুর্বাহ্ন, অহ্নের সায়(অবসান)=সায়াহ্ন, অহ্নের অপর(শেষভাগ)=অপরাহ্ন ইত্যাদি।

ঘ. পরপদে রাজি, গ্রাম, বৃন্দ, গণ, যুথ প্রভৃতি সমষ্টিবাচক শব্দ থাকলে যষ্ঠ তৎপুরুষ সমাস হয়। যথা ছাত্রের বৃন্দ =ছাত্রবৃন্দ, গুণের গ্রাম=গুণগ্রাম, হস্তীর যুথ = হস্তীয়ুথ ইত্যাদি।

ঙ. অর্ধ শব্দ পরপদ হলে সমস্তপদে তা পূর্বপদ হয়। যেমন – পথের অর্ধ= অর্ধপথ, দিনের অর্ধ=অর্ধদিন।

চ. শিশু, দুগ্ধ, অণ্ড(ডিম্ব) ইত্যাদি শব্দ পরে থাকলে স্ত্রীবাচক পূর্বপদ পুরুষবাচক হয়। যেমন – মৃগীর শিশু = মৃগশিশু, ছাগীর দুগ্ধ = ছাগদুগ্ধ, হংসীর ডিম্ব = হংসডিম্ব ইত্যাদি।

ছ. অলুক ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাসঃ ঘোড়ার ডিম, মাটির মানুষ, হাতের পাঁচ, মামার বাড়ি, সাপের পা, মনের মানুষ, কলের গান ইত্যাদি।

কিন্তু, ভ্রাতার পুত্র = ভ্রাতুষ্পুত্র (নিপাতনে সিদ্ধ)।

৬. সপ্তমী-তৎপুরুষ সমাস : পূর্বপদে সপ্তমী বিভক্তি (এ, য়, তে, এতে) লোপ হয়ে যে সমাস হয় তাকে সপ্তমী-তৎপুরুষ সমাস বলে। যেমন : গাছে পাকা = গাছপাকা, দিবায় নিদ্রা = দিবানিদ্রা। এরূপ – বাকপটু, গোলাভরা, তালকানা, অকালমৃত্যু, বিশ্ববিখ্যাত, ভোজনপটু, দানবীর, বাক্সবন্দি, বস্তাপচা, রাতকানা, মনমরা ইত্যাদি।

সপ্তমী তৎপুরুষ সমাসে কোনো কোনো সময় ব্যাসবাক্যে পরপদ সমস্তপদের পূর্বে আসে। যেমন–পূর্বে ভূত = ভূতপূর্ব, পূর্বে অশ্রুত = অশ্রুতপূর্ব, পূর্বে অদৃষ্ট = অদৃষ্টপূর্ব।

৭. নঞ তৎপুরুষ সমাসঃ না বাচক নঞ অব্যয় (না, নেই, নাই, নয়) পূর্বে বসে যে তৎপুরুষ সমাস হয়, তাকে নঞ তৎপুরুষ সমাস বলে। যথা— ন এক = অনেক, ন আহত= অনাহত, ন আচার = অনাচার, ন কাতর = অকাতর। এরূপ – অনাদর, নাতিদীর্ঘ, নাতিখর্ব, অভাব, বেতাল ইত্যাদি।

‘ন’ খাঁটি বাংলায় অ, আ, না কিংবা অনা হয়। যেমন – ন কাল = অকাল বা আকাল। তদ্রুপ— আধোয়া, নামঞ্জর, অকেজো, অজানা, অচেনা, আলুনি, নাছোড়, অনাবাদী, নাবালক ইত্যাদি।

না-বাচক অর্থ ছাড়াও বিশেষ বিশেষ অর্থে নঞ তৎপুরুষ সমাস হতে পারে। যথা-
অভাব অর্থে, ন বিশ্বাস = অবিশ্বাস (বিশ্বাসের অভাব)।
ভিন্নতা অর্থে, ন লৌকিক = অলৌকিক ।
অল্পতা অর্থে, ন কেশা = অকেশা ।
বিরোধ অর্থে, ন সুর = অসুর।
অপ্রশস্ত অর্থে, ন কাল = অকাল
মন্দ অর্থে, ন ঘাট = অঘাট
এরূপ – অমানুষ, অসঙ্গত, অভদ্র, অনন্য, অগম্য ইত্যাদি।

৮. উপপদ তৎপুরুষ সমাস: যে পদের পরবর্তী ক্রিয়ামূলের সঙ্গে কৃৎ—প্রত্যয় যুক্ত হয় সে পদকে উপপদ বলে। যেমন স্বর্ণ + কৃ + অ = স্বর্ণকার, এখানে ‘স্বর্ণ’ হল উপপদ। কৃদন্ত পদের সঙ্গে উপপদের যে সমাস হয়, তাকে বলে উপপদ তৎপুরুষ সমাস। যেমন – জলে চরে যা = জলচর, জল দেয় যে = জলদ, পঙ্কে জন্মে যা = পঙ্কজ। এরূপ — গৃহস্থ, সত্যবাদী, ইন্দ্রজিৎ, ছেলেধরা, ধামাধরা, পকেটমার, পাতাচাটা, হাড়ভাঙ্গা, মাছিমারা, ছারপোকা, ঘরপোড়া, বর্ণচোরা, গলাকাটা, পা-চাটা, পাড়াবেড়ানি, ছা-পোষা ইত্যাদি।

৯. অলুক তৎপুরুষ সমাস:
যে তৎপুরুষ সমাসে পূর্বপদের বিভক্তি লোপ হয় না, তাকে অলুক তৎপুরুষ সমাস বলে। যেমন : গায়ে পড়া = গায়েপড়া। এরুপ-ঘিয়ে ভাজা, কলে ছাঁটা, কলের গান, গরুর গাড়ি, পেটের দায়, চোখের বালি ইত্যাদি।

দ্রষ্টব্যঃ গায়ে-হলুদ, হাতেখড়ি প্রভৃতি সমস্তপদে পরপদের অর্থ প্রধান রূপে প্রতীয়মান হয় না। অর্থাৎ হলুদ বা খড়ি বোঝায় না, গায়েহলুদ নামে অনুষ্ঠান বিশেষকে বোঝায়। সুতরাং এগুলো অলুক তৎপুরুষ নয়, অলুক বহুবীহি সমাস

Add a Comment